একুশে বইমেলায় তরুণদের উপস্থিতিএকুশে বইমেলা ২০২৬ নিয়ে তরুণদের ভাবনা

বইমেলা পাঠকদের মনে নতুন করে পড়াশোনা ও লেখালেখি করার চিন্তা ও স্বপ্ন জাগায় যা দেশের ইতিবাচক পরিবর্তনের অনন্যা ভূমিকা হিসেবে প্রতিবছরই বইমেলার উৎসব পালিত হয়ে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের বইমেলা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মতামত তুলে ধরেছেন কলাম ও ফিচার লেখক মো. মনিরুল ইসলাম।

“তরুণ লেখকদের লঞ্চপ্যাড একুশে বইমেলায়”

অমর একুশে বইমেলা শুধু বই কেনাবেচার স্থান নয়-এটি একজন লেখকের আত্মপ্রকাশের এবং সকল বিষয়ের চর্চায় যুক্ত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্লাটফর্ম। প্রতি বছর হাজারো তরুণ লেখকরা একুশে বইমেলায় এসে  প্রথমবারের মতো পাঠকের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পান।

অমর একুশে বইমেলা তরুণদের জন্য প্রকাশকদের সঙ্গে সরাসরি সেতুবন্ধনের মতো যোগাযোগ পথ তৈরি করে। বইমেলায় লেখকের বই সরাসরি পাঠকের হাতে পৌঁছায়, বইমেলায় পাঠকের সরাসরি প্রতিক্রিয়া পাওয়ায় লেখকদের লেখার প্রতি আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। এই মেলায় তরুণ লেখকরা প্রবীণ লেখকদের সাথে সাক্ষাৎ, সাহিত্য আড্ডা, আলোচনা সভা ও বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের মতো আয়োজন তরুণদের অনুপ্রাণিত করে, নতুন করে লিখতে গভীর আগ্রহ তৈরি করে।

বাস্তবতা হলো, অনেক প্রতিভাবান তরুণ লেখকরা আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং প্রকাশনা জটিলতার কারণে এখনও পিছিয়ে পড়ছেন। বড় প্রকাশনীর আড়ালে নতুনদের বই অনেক সময় পাঠকের নজরেই আসে না। তাই নতুন তরুণ লেখকদের জন্য আলাদা কর্নার, লেখক কর্মশালা, কম খরচে প্রকাশনার সুযোগ এবং নবীন লেখক সম্মাননা চালু করা গেলে বইমেলার কার্যকারিতা আরও বাড়বে।

একটি জাতির সাহিত্যভিত্তি বড় অংশ গড়ে ওঠে তরুণ প্রজন্মের হাত ধরেই। সেই প্রজন্মকে উৎসাহিত করার অন্যতম মাধ্যম হলো এই বইমেলা। তাই যথাযথ পরিকল্পনা ও সহযোগিতা পেলে বইমেলা তরুণ লেখকদের জন্য সত্যিকার অর্থে একটি শক্তিশালী সাহিত্যিক সেতুবন্ধনে পরিণত হতে পারে।

“বইমেলায় বই দিয়েই শুরু হোক পরিবর্তন”

“সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই মাধ্যম হলো বই। অস্ত্র বা স্লোগানে ক্ষণস্থায়ী আলোড়ন তৈরি হতে পারে, কিন্তু মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয় একমাত্র পাঠাভ্যাস। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে সমাজ বইকে গুরুত্ব দিয়েছে সেই সমাজই জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিকতায় এগিয়ে গেছে।
আজকের বাস্তবতায় আমরা প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়লেও বইয়ের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি,  বরং বেড়েছে। কারণ বিভ্রান্তি, গুজব ও অর্ধসত্যের এই সময়ে বইই পারে গভীর চিন্তা ও সত্য অনুসন্ধানের পথ দেখাতে। বইমেলা, প্রকাশনা কিংবা নতুন লেখকের সংখ্যা বাড়লেও প্রকৃত পাঠক তৈরির প্রশ্নটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ রয়েগেছে।
সত্যিই যদি আমরা পরিবর্তন  চাই, তবে তা শুরু হোক বই পড়া দিয়ে পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং ব্যক্তিগত জীবনে। বই কেবল জ্ঞান দেয়না, মানুষকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবেও গড়ে তোলে। তাই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ হোক একটি ভালো বই দিয়ে।

“বইমেলা হোক সঠিক ইতিহাসের পথপ্রদর্শক”

মানুষের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হলো বই। বই আমাদের এমন এক সঙ্গী, যা আমাদের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে জীবনের প্রত্যেকটি মুহূর্তে। বই জ্ঞানের এমন এক অফুরন্ত ভাণ্ডার; যেখানে খুঁজে পাওয়া যায় পৃথিবীর বহুমাত্রিক বিষয় সম্পর্কে নানান অজানা কথা। বইয়ের সাথে সম্পর্ক গাঢ় হলেই প্রবেশ করা যায় জ্ঞানের এক অনন্য জগতে।


প্রতিবারের বইমেলা থেকে এবারের বইমেলা হবে খানিকটা ভিন্ন—এমনটা কিন্তু নিঃসন্দেহেই বলা যায়। কারণ বিগত ১৭ বছর বইমেলাতে এমনসব বইগুলোকে নিরবে রাখা হয়েছিল; যেগুলোতে লেখা ছিল বাংলাদেশের সত্যিকারের ইতিহাস। তরুণ থেকে প্রবীণ সকলেই এমন কিছু বইয়ের সহিত সম্পর্ক স্থাপন করেছিল, যাতে বাংলাদেশের আসল ইতিহাসের ছায়াটুকু পর্যন্তও ছিল না। গল্প কিংবা কবিতা—পাঠকেরা যা কিছুই পাঠ করুক না কেন; সবকিছুতেই জড়িয়ে থাকে ইতিহাসের সূক্ষ্ম ছিটেফোঁটা।


বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস জানতে বেশ আগ্রহী। তাই, বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিতে এবারের বইমেলা হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর ও শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। সুতরাং, কর্তৃপক্ষের নিকট বিনীত অনুরোধ—২০২৬ এর বইমেলায় যেন এমন কিছু বইকে স্থান দেওয়া হয়, যা থেকে তরুণ ও প্রবীণ উভয়ই বাংলার সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে। কারণ, সঠিক ইতিহাসই একটি জাতিকে সামনের দিকে অগ্রসর হতে অনুপ্রাণিত করে।

“টাকা দিলে বই, হারিয়ে যায় পাঠক”

বই প্রকাশ আজ আর কেবল সাহিত্যচর্চার ফল নয়—অনেক ক্ষেত্রে এটি হয়ে উঠেছে আর্থিক লেনদেনের বিষয়। টাকা দিলেই বই বের হচ্ছে, প্রকাশনার ছাপ পাচ্ছে এমন অনেক লেখা, যেগুলোর ভাষা, কাঠামো কিংবা ভাবনায় ন্যূনতম মানদণ্ডও পূরণ হয় না। প্রশ্ন হলো, এই বইগুলো কি নতুন পাঠক তৈরি করছে, নাকি উল্টো বইয়ের প্রতি অনীহা জন্ম দিচ্ছে?


নতুন পাঠকের কাছে প্রথম অভিজ্ঞতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মানহীন লেখা যদি কারও হাতে প্রথম বই হিসেবে পৌঁছে যায়, তবে সে বইয়ের স্বাদ পায় না—পায় বিরক্তি। পাঠকের মনে গেঁথে যায় এক ধরনের ধারণা: বই মানেই দুর্বোধ্য, এলোমেলো, সময়নষ্ট। এভাবেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় বই বিমুখতা। একটি দুর্বল বই শুধু নিজের ক্ষতি করে না; সম্ভাব্য বহু পাঠককেও দূরে সরিয়ে দেয়।


অন্যদিকে, বই প্রকাশ করাকে অনেকেই লেখক পরিচয়ের শর্টকাট হিসেবে দেখছেন। লেখা পরিণত হলো কি না, নিজেকে সময় দিয়ে ঘষামাজা করা হলো কি না—এসব প্রশ্ন তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। বই হাতে এলেই নিজেকে ‘লেখক’ হিসেবে উপস্থাপনের তাড়না দেখা যায়। অথচ লেখক হওয়া কোনো সনদ নয়; এটি দীর্ঘ সাধনা, পাঠ আর আত্মসমালোচনার ফল।


প্রকাশকের দায়ও এখানে কম নয়। বাণিজ্যিক লাভের তাগিদে যদি মান যাচাইয়ের জায়গাটি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে প্রকাশনা শিল্প নিজেই নিজের ভিত কেটে ফেলে। বইয়ের সংখ্যা বাড়লেই যে সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়, তা নয়—বরং মানহীনতার ভিড়ে ভালো লেখাও চাপা পড়ে যায়।


অমর একুশে বইমেলা আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতির সবচেয়ে দৃশ্যমান আয়োজন। এই মেলাকে ঘিরে যদি মানের প্রশ্নে আপস চলতেই থাকে, তবে ক্ষতিটা হবে দীর্ঘমেয়াদি। বই প্রকাশের আগে দায়িত্বশীলতা, লেখার আগে প্রস্তুতি—এই দুটো জায়গায় সততা ফিরলেই কেবল বইমেলা পাঠক তৈরি করার শক্তি ফিরে পাবে।


মহান শহিদ দিবসে স্মারক ডাকটিকিট উন্মোচন করলেন প্রধানমন্ত্রী