লেখক: নিশাত রহমান নিশি
বাড়িতে চোখ ঝলসানো জমকালো আলো চারিদিকে। লাল, নীল, সবুজ, হলুদ বিভিন্ন রঙের আলোয় ভরে উঠেছে। লাল-সবুজ বাতি নিভলে নীল-হলুদ জ্বলে উঠছে। এই নিয়মেই কয়েকদিন ধরে তারা জ্বলে-নিভে উঠছে। ছোট বাচ্চারা একদিকে গানের তালে নৃত্য করছে। বাড়ির কর্তা জয়ন্ত মিত্র সবকিছু তদারকি করছেন। কিছুক্ষণ পরপরই তিনি ধমক দিচ্ছেন বাকি সদস্যদের ওপর। অবশ্য বিয়েবাড়িতে বড়দের রেগে থাকাটাও একটা রীতি। একই সঙ্গে জয়ন্ত মিত্রকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে। তার মুখ যেনো বিষণ্নতার আকাশ। অবশ্য কাল তার ছোট মেয়ে অনিমার বিয়ে নির্বিঘ্নে সমাপ্তি হলে তার প্রশান্তি।
মুরুব্বিরা বলাবলি করছে, উপমার বিয়া ঠিক আছিল, কিন্তু শেষে গিয়া বিয়াডা হইবো তার ছোট বোন অনিমার লগে। উপমার মতো নক্ষত্রী মাইয়া ছাইড়া অনিমারে বিয়া করে—হেইডা আবার কেডা রে এমন বেকুব পোলা! উপমার কপালডা বড়ই পোড়া রে; এমন ভালো ঘরে সমন্ধ আইছিল, তয় ঘর করা আর হইল না। আহা রে, বড়ই অভাগী মাইয়াডা। পাশ থেকে মলিনা বলে উঠলো,
আমার দিদিভাইয়ের নামে এহন কেউ এইরকম কথা কইলে, তোমাগো মুখডা ভাইঙ্গা দিমু কিন্তু!
বলেই ছাদে চলে গেল। মলিনা হল এই বাড়ির কাজের মেয়ে। তবে দীর্ঘদিন কাজ করায় তার একটি দাপট তৈরি হয়েছে। উপমা ছাদের এক কোণে বসে আছে। সবকিছুই দেখছে সে। মলিনা দৌড়ে ছাদে চলে আসে। পিছন থেকে ডাকে
~উপমা দিদি।
~তোকে কতবার বলেছি মলিনা, বড়দের সাথে এভাবে কথা বলতে হয় না।
~ রাগ কইরো না দিদিভাই, তোমারে নিয়া কেউ বাজে কথা কইলে আমার সহ্যি অয় না; মাথাডা একেবারে গরম হইয়া যায়। চা খাবে দিদিভাই?
~ না। এখন আর চা খাব না। তুই আমার পাশে এসে বস।
~তোমার চুলে হাত বুলিয়ে দি?
~দে।
মলিনা চুলের খোপা খুলে দেয়। মেঘের মতো ছড়িয়ে পড়ে চুলগুলো। জোসনা রাত, চাঁদের আলোয় চিক চিক করছে চুলগুলো। মলিনা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কি অপরূপ লাগছে তার দিদিভাইকে। সে কল্পনা করছে পরী বুঝি এমনই হয়। রাত পোহালে তার দিদিভাইয়ের বিয়ে। লাল বেনারসি তে কি অপরূপ লাগত। সিঁথিতে লাল সিঁদুর, যেন দেবী দুগ্গার প্রতি রূপ। অথচ তা দেখার সৌভাগ্য হলো না।
উপমা দিঘির জলের মতো শান্ত হয়ে বসে আছে। চোখগুলো যেন অসীম ক্লান্ত। মলিনা হঠাৎ হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। উপমা মলিনাকে কাছে টেনে নিলো। উপমার চোখ গড়িয়ে জল পড়ছে। মলিনা তুই কেন কাঁদছিস? শোন তুচ্ছ কারণে কখনো কাঁদতে নেই। যারা অন্যের দুঃখে নিজের চোখে পানি ফেলে তারা ভীষণ বোকা।
~ তোমার কি কষ্ট অয় না? তোমার তো কাল বউ সাজনের কথা আছিল, তাইলে এইসব অন্যায় ক্যান মাইনা নিলা দিদিভাই?
~ শোন পাগলী, যে কাজে সকলে খুশি হয় সে কাজ অন্যায় না। বাবা খুশি, মা খুশি, আমার বোন অনিমা খুশি, ও বাড়ির কাকা-কাকিমা খুশি, আর সবচেয়ে বড় কথা তোর অয়নদাদা খুশি। সে তো প্রতিবাদ করেনি। তাহলে কি আমার কষ্ট পাওয়া উচিত বল?
মলিনা উত্তর দেয় না। চুলে বেণী করতে থাকে।
পিলখানা হত্যাযজ্ঞের নেপথ্যে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ববিরোধী চক্র : প্রধানমন্ত্রী
১লা ফাল্গুন। বুধবার।
বাঙালি নারীরা এই দিন নতুন ফুলের মত সেজে ওঠে। উপমা আজ বাসন্তী রঙের শাড়ি পড়েছে। কানে গুঁজেছে জবা ফুল। মলিনা বলে উঠল, “তোমাগো দেখে তো পরীরাও হিংসে কইরবে দিদিভাই।” উপমা ছুটে চলে যায় বাবার ঘরে। বাবার সাথে এক ভদ্রলোক বসে আছে। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী খন্দকার রায়। উপমা নমস্কার করে। জয়ন্ত মিত্র বলেন, এটা আমার বড় মেয়ে। উপমা! আনন্দিতা উপমা। উপমা চলে যায় মার রান্নাঘরে। দেখো মা তোমার মেয়েকে কেমন মানিয়েছে তোমার শাড়িতে। আমার মেয়ে তো সাক্ষাৎ দুগ্গা ঠাকুর। অনিমা উঠে তার কক্ষে চলে যায়।
সেদিন রাতেই খন্দকার রায় টেলিফোনে জয়ন্ত মিত্রকে তার ছেলের সাথে উপমার বিবাহের প্রস্তাব দেয়। এবং বলেন, স্বপরিবারে উপমাকে দেখতে আসবে যদি তিনি অনুমতি দেন। জয়ন্ত মিত্র তো মহা খুশি। তিনি ব্যবসা বাণিজ্য করে বেশ পয়সা জমিয়েছেন। দুই মেয়েকে বিরাট আয়োজন করে বিবাহ দিবেন এটাই তার স্বপ্ন। বাড়িতে এলাহী আয়োজন। বিভিন্ন রকমের খাবার রান্না করা হয়েছে। পোলাও, নিরামিষ, পাবদা মাছ, দই, মিষ্টি সহ বিভিন্ন ধরনের খাবার। দুপুর নাগাদ খন্দকার রায় স্বপরিবারে এ বাড়ি পৌঁছালেন।
উপমাকে একটি আকাশি রংয়ের শাড়ি পড়ে ঘোমটা টেনে কক্ষে প্রবেশ করানো হলো। সকলে মুগ্ধ হয়ে যাই তাকে দেখে। যেন সত্যি দেবী দুর্গার প্রতিরুপ। উপমা ও অয়নকে নিজেদের মধ্যে কথা বলার জন্য ছাদে পাঠানো হয়। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে অয়ন। সে তার দীর্ঘ জীবনে এমন অপরূপ নারী দেখেনি। এভাবেই কেটে যায় কিছু সময়।
উপমা~ আপনার কিছু বলার না থাকলে নিচে চলুন। সকলে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
অয়ন~ বাবার মুখে গতকাল শুনেছি আপনি নাকি অসম্ভব সুন্দরী। আপনার ছবি এঁকেছি কল্পনায়। বাস্তবে আপনি আমার কল্পনার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর আনন্দিতা উপমা।
এতোক্ষণে উপমা ছেলেটির চোখের দিকে তাকায়। অনেকদিন পর তাকে কেউ পুরো নাম ধরে ডাকলো। এই প্রথম কোন ছেলের দিকে সে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল।
অয়ন~ আপনার নামটি খুব সুন্দর। আপনার নাম নিশ্চয়ই আপনার বাবা রেখেছেন?
উপমা~ হ্যাঁ। আমার বাবা-মার বিয়ের দীর্ঘবারো বছর পর আমার জন্ম। আমার জন্মের পর বাড়ি আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। বাবার চোখে আমাকে লেগেছে অসম্ভব সুন্দরী। তিনি আমায় তুলনা করার মতো কিছু পাননি। আমি নাকি তুলনাহীন। আমায় পেয়ে তার জীবনটা আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। সকল দুঃখ কষ্ট চলে গেছে। তাই নাম রাখলেন আনন্দীতা উপমা। সকলে উপমা বলে ডাকত। বাবা ভীষণ রাগ করতেন। আপনাকে ধন্যবাদ অয়নবাবু।
খন্দকার রায় একজোড়া সোনার বালা পরিয়ে দেয় উপমাকে। বিয়ের তারিখ ঠিক করার সময় উপমা বাঁধা দেয়। কিছুদিন পরই তার মেডিকেল ফাইনাল ইয়ার পরীক্ষা শুরু হবে। সে চায় না বিয়ের জন্য পড়াশোনার ক্ষতি হোক। অনেক কষ্ট করে সে এই পর্যন্ত এসেছে। ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করায় তার জীবনের লক্ষ্য। উপমা চার মাস সময় চেয়ে নেন খন্দকার রায় এর পরিবারের কাছে। অয়ন বি.এ পাস করেছে অনেক আগে। এখন বাবার ব্যবসা সামলাচ্ছেন। অয়ন উপমার পরিস্থিতি বুঝলো। চার মাস পরই বিয়ের তারিখ ঠিক করবেন বললেন। তবে তার একটা শর্ত আছে। মাঝে মাঝে উপমাকে দেখার জন্য এই বাড়িতে আসবেন। কঠিন স্বরে জানান, চার মাস উপমাকে না দেখে থাকা সম্ভব না তার পক্ষে। মলিনা উচ্চস্বরে হেসে ওঠে। উপমা লজ্জায় কক্ষ থেকে চলে যায়। তবে ঠোঁটের কোণের মুচকি হাসি অয়ন ঠিকই লক্ষ করে।
——
রাত গভীর হচ্ছে। মলিনার চোখে ঘুম চলে আসছে।
~“দিদিভাই, নিচে যাইয়্যা ঘুমাই। সকালে তোমার মা চিল্লাচিল্লি শুরু করব, কামও করতে হইব। আমার তো কুনো কাম করতে মন চায় না। চলো না, আমি আর তুমি কাল অন্য কুনো জায়গা ঘুইরা আই।”
~ তা হয় না মলিনা। কাল আমার আদরের ছোট বোনের বিয়ে। আমি সকল কাজ করবো।
মলিনা রেগে তার কক্ষে চলে যায়। উপমা চলে যায় নিজের কক্ষে। পুরো বাড়ি এখন নিস্তব্ধ। সকলে ঘুমিয়ে গেছে। সারাদিনের কাজে সকলে ক্লান্ত। উপমাও কাজ করেছে, যদিও তার মা কক্ষের মধ্যে থাকতে বলেছে। উপমা ভীষণ ক্লান্ত। গভীর ঘুমে তার চোখ জুড়িয়ে আসছে। সে চোখ বন্ধ করলো। ঝাঁকড়া চুলে, কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে, একটি শ্যামলা বর্ণের ছেলে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কি নির্লজ্জ ছেলেটি! ছেলেটি ডাকে, আনন্দিতা উপমা! এতো অয়ন বাবুর গলা। উপমা চমকে ওঠে। মোমবাতি জ্বালায়। জানালা খুলে দেয়। ঠান্ডা বাতাস আসছে। কাল ছেলেটি তার আদরের ছোট বোনকে সিঁদুর দিয়ে রাঙিয়ে দেবে, আর আজ তার স্বপ্নে আসছে। এ ভারি লজ্জার, এই বিরাট অন্যায়।
রাতটা যেন ক্রমান্বয়ে গভীর হচ্ছে। উপমা সূর্যের আলোর অপেক্ষা করছে। টেবিলে রাখা একটি বই বের করে। সেখানে একটি নীল রঙের চিঠি। উপমাকে লেখা অয়ন বাবুর চিঠি। উপমা চিঠিটি খুললো।
আনন্দিতা উপমা,
তোমাকে বহুদিন দেখিনা। কাজে কোন ভাবেই মন দিতে পারছি না। শুধু কল্পনায় ভেসে ওঠে তোমার ঐ মায়াভরা মুখ। ভেসে ওঠে লাল বেনারসিতে, রক্তজবার মতো একটি মেয়ের ছবি। কিন্তু তাকে আমি ছুঁতে পারি না। ব্যবসার কাজে চিটাগাং এসে আটকে পড়েছি। খুব দ্রুতই ফিরে আসবো। কেমন আছো তুমি? এখান থেকে তোমার জন্য বেনারসি কিনে নিয়ে যাব। তোমার পত্রের অপেক্ষায় রইলাম। ভালো থেকো।
ইতি
তোমার অয়ন বাবু
চিঠিটা এই পর্যন্ত কয়েক হাজার বার উপমা পড়েছে। প্রত্যেক শব্দ তার মুখস্ত। নিয়ম করে দিনে কয়েকবার চিঠিটা পড়া তার অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিত্তরে উপমা চিঠি লিখে। আবার কেটে দেয়। পুনরায় লিখে। প্রতিবারই তার মনে হয় কিছু ভুল হচ্ছে। অনুভূতি বেশি প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে। যা অনুচিত। কিংবা শব্দগুলো খুব বেশি কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বাবাকে যেমন বিভিন্ন চিঠি লিখে সাহায্য করে তেমন। অয়ন বাবুর প্রেমময় চিঠির প্রতিত্তরে এমন কঠিন চিঠি বড় বেমানান। উপমা সর্বশেষ লেখা চিঠিটাও ছিঁড়ে ফেললো।
১২ জৈষ্ঠ্য। বুধবার।
উপমার ফাইনাল পরীক্ষা শেষের দিকে। খন্দকার রায় গতকাল টেলিফোনে জয়ন্ত মিত্রকে স্বপরিবারে নিমন্ত্রণ করেছে। বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করার উদ্দেশ্যে। পরদিন জয়ন্ত মিত্র ও তার স্ত্রী যশোমতী দেবী রওনা দেয়। সন্ধ্যা নাগাদ তারা খন্দকার বাড়ি পৌঁছে যায়। বিশাল প্রাচীন বাড়ি। জমিদারদের প্রাসাদের মত। যশোমতী দেবীর চোখ দাঁড়িয়ে যায়। অবশ্য সে আগেই জেনেছে খন্দকার রায় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, ধনী পরিবার। তবে যেমন কল্পনা করেছে বাস্তবে তার থেকে কয়েক গুণ বেশি। অয়ন দুদিন আগেই চিটাগাং থেকে ফিরে এসেছে। সকলে মিলে বিয়ের আলোচনা আরম্ভ করল। এক পর্যায়ে যশোমতী দেবী বলেন, বেয়াই মশাই আপনার সাথে আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। আমরা আপনার কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ কথা লুকিয়েছি।
উপমা আমাদের কন্যা না। খন্দকার রায় অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন, কি ভুলভাল বলছেন আপনি? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কক্ষে থাকা সকলে বিস্মিত হয়ে যান। একে অপরের দিকে তাকায়। সবচেয়ে বেশি যিনি অবাক হয় তিনি জয়ন্ত বাবু। হঠাৎ তার স্ত্রী এই কথা কেন বললেন। তিনি থামানোর চেষ্টা করলেন যশোমতী দেবীকে। খন্দকার রায় রেগে বলে উঠলেন, আপনি মিথ্যাবাদী জয়ন্ত বাবু। দীর্ঘবারো বছর থেকে আপনি আমার বন্ধু হয়ে আছেন। বন্ধুত্বের সম্পর্কটাকে আরো মজবুত করার জন্য আপনার মেয়ের সাথে আমার পুত্রের বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। আর এতদিন পর এসে বলছেন, সে কন্যা আপনার না। আমাকে ঠকানোর সাহস কিভাবে পান? জয়ন্ত বাবু লজ্জায় পড়ে যায়। বলার মতো কথা তার কাছে নেই। যশোমতী দেবী পুনরায় বললেন, আমার বিয়ের দীর্ঘবারো বছর পার হয়ে যায়। কিন্তু সন্তানের মুখ দেখতে পারিনি। তাই দুজন সিদ্ধান্ত নিলাম একটি সন্তান দত্তক নেব। তাকে কোলে নিয়ে সন্তান না হওয়ার যে যন্ত্রনা, তা কিছুটা কমবে। হাসপাতাল থেকে উপমাকে নিয়ে আসি। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়েছিল উপমা। বাবা-মার মাথায় ছিল ঋণের বোঝা। উপমা ছিল চতুর্থ কন্যা। টাকার বিনিময়ে আমরা উপমাকে দত্তক নিয়েছিলাম। এই সত্য আমরা স্বামী-স্ত্রী ছাড়া কেউ জানে না। এমনকি উপমাও না।
উপমাকে ঘরে আনার দুই বছরের মাথায় জন্ম নেয় আমার মেয়ে অনিমা। আমাদের একমাত্র কন্যা। এ ছাড়া আমার কোন সন্তান নেই। অয়ন দরজার কাছে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। খন্দকার রায় স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন এই বিবাহ সম্ভব নয়। কোন আশ্রিতাকে তিনি ঘরের বউ বানাবেন না। জয়ন্ত মিত্রের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়লো। তিনি স্পষ্ট জানালেন উপমা তার বড় মেয়ে। কোন আশ্রিতা নয়। এবং এই সত্যটা এতদিন লুকানোর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। খন্দকার রায় বুদ্ধিমান মানুষ। ব্যবসার প্রসার ঘটানোই তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। তিনি বললেন, উপমা আপনার কন্যা না কিন্তু অনিমা তো কন্যা। আমাদের ব্যবসায়িক সম্পর্কটা যেন নষ্ট না হয় তাই আপনার সম্মতি থাকলে অনিমার সাথে আমার পুত্রের বিয়ে দিতে পারি। খুশিতে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে যশোমতী দেবী সম্মতি জানায়। এতক্ষণে জয়ন্ত মিত্র সবটা বুঝতে পারলেন। তার স্ত্রী এই বিশাল সম্পত্তির লোভ সামলাতে পারেনি। তাই এই ঘরেই নিজের মেয়েকে পাঠানোর বন্দোবস্ত করলো। অয়ন এই প্রস্তাব মানতে রাজি হয় না। তবে বাবার উপর কথা বলার সাহস তার এখনো হয় নি। একপর্যায়ে বাবার কথায় সম্মতি জানালো।
বিবাহের দিন:
ভোর হতে না হতে বাড়ির বড়রা গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানের কাজ শুরু করে দিয়েছে। ছোট বাচ্চারা হলুদ শাড়ি-পান্জাবি পড়ে সাজতে শুরু করেছে। উপমা বাড়িটি সুন্দরভাবে সাজাচ্ছে। অনিমা হলুদ শাড়ি পড়েছে। বেশ লাগছে দেখতে। দীঘির পাড়ে গায়ে হলুদের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সকলে মিলে দীঘির দিকে হাঁটতে থাকলো। উপমাও সাথে হাঁটছে। এরপর বেশ মনোরম করে সম্পন্ন হয় গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান। উপমা আদর করে তার বোনকে হলুদ মাখায়। বড়রা অবাক হয়ে সে দৃশ্য দেখে।
গোধূলি লগ্ন। চারিদিকে ঝাপসা অন্ধকার হয়ে আসছে। মন্ডব রেডি। পুরোহিত মন্ত্র পড়ে আগুনে অর্ঘ দিচ্ছে। অনিমাকে লাল বেনারসিতে সাজানো হয়েছে। মাথায় ঘোমটা। কি অপরুপ লাগছে। উপমা ভাবে এই বেনারসি আমার জন্য অয়ন বাবু চট্টগ্রাম থেকে এনেছিলেন! বেনারসির দিকে স্থীর চোখে উপমা তাকিয়ে রইলো। হঠাৎ করেই সকলে চিল্লাপাল্লা শুরু করলো। যশোমতী দেবী বরণডালা নিয়ে গেটের দিকে রওনা দিলেন। অয়ন বাবু এসেছে। আর কিছুক্ষণ পরেই বিয়ে শুরু হবে। উপমার এতক্ষণে ভীষণ অসহায় লাগছে। সে কিছুতেই মন্ডপে থাকতে পারছে না। তার ভীষণ কান্না পাচ্ছে। পায়ের নিচের মাটি মনে হচ্ছে কাঁপছে। ইচ্ছে ছিল দাড়িয়ে থেকে এই বিয়ে সম্পূর্ণ করবে। কিন্তু এই মুহুর্তে তা আর সম্ভব হচ্ছে না। সে এক দোড়ে দোতলায় কোণার রুমে চলে যায়। জানালা-দরজা সব বন্ধ করে দেয়। টেবিলে বসে পড়ে। উপমা কাঁদতে থাকে। চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। কেউ শুনতে পায় না সেই শব্দ। উপমা জানে কান্না করে বোকা মানুষ। সে তো বুদ্ধিমতী, সাহসী। তার কান্না করা উচিত না। তবুও সে অঝোরে কেঁদে চলেছে। উপমা একটা ডায়রি নেয়। লিখতে শুরু করে।
প্রিয় অয়ন বাবু,
আমি সেদিন বাবা-মার ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম। আর বিয়ের দিনও কি সকলের মাঝে আপনি সেই অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকবেন? এটা কল্পনা করে মনে মনে বলছিলাম কি নির্লজ্জ আপনি। এগুলা ভাবতে ভাবতে বাবা মা চলে আসলো। আমায় তাদের কক্ষে ডাকলো। তারা জানালো আমি তাদের কন্যা না। আমায় কেবল তারা লালন পালন করেছে। তাদের একমাত্র কন্যা অনিমা। ওইদিন আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। এতোগুলা বছর যাদের বাবা-মা ডেকে আসছি সে আমার মা না, আমার বাবা না। আমার চোখ গড়িয়ে অনবরত জল পড়তে থাকলো। আমার জন্মদাতা বাবা-মা ঋন পরিশোধের টাকার জন্য আমায় এদের কাছে দিয়েছিলেন। আমার জন্মের পরই সেই বাবা-মা আমায় ঠকিয়েছেন। মা জানালো আপনার বাড়ির লোক এই বিয়ে দিতে চায় না। তারা এই বিয়ে ভেঙে দিয়েছে। এবং অনিমার সাথে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হয়েছে। আমি মাকে বললাম, মা তুমি কি তাহলে তোমার মেয়ের সাথে বিয়েটা দেওয়ার জন্যই এতোদিনের গোপন কথা আজ ওখানে তুলেছিলে? মা চুপ করে রইলো। আমার আর কিছুই বোঝার বাকি রইলো না। আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলাম। বললাম আমি তোমারই মেয়ে। আমি আনন্দিতা উপমা তোমার সাথেই থাকবো আজীবন। আমি জানতে চায়লাম, আপনার মতামত কি ছিল। মা বললেন, অয়নও এই বিয়েতে সম্মতি জানিয়েছে। আমার কথাটি বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো। আমি অবাক হলাম মানুষ লোভ সামলাতে পারে না কেনো? এটা ভেবে। জন্মের পরই আমার বাবা-মা টাকার লোভে আমাকে বিক্রি করে দিলো। যাকে এতোদিন মা বলে জেনেছি সেই মা সম্পত্তির লোভে তার মেয়েকে তোমার সাথে বিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত করে আসলো। আর আপনি ব্যবসার প্রসার ঘটাতে আমারই বোনকে বিয়ে করতে আসবেন। ছোটবেলায় বাবা একটা কথা বলতেন, পৃথিবীতে সকলের জীবনে অন্তত একবার সুযোগ আসে নিজের ভেতরের পশুটিকে বের করে আনার। যারা সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারে তারা বুদ্ধিমান। যারা পারে না তারা বোকা, ভীষণ বোকা। আপনারা সকলেই বুদ্ধিমত্ত্বার পরিচয় দিয়েছেন।
যাগগে সে কথা,
সেদিন ছাদে কি বোকার মতো আমার দিকে চেয়েছিলেন আপনি। আমি অবাক হয়ে আপনায় দেখছিলাম। আপনার পাঠানো চিঠিটা আমি কতবার পড়েছি তা আপনি জানলেন না। কতবার শাড়ীর আঁচল দিয়ে সেই চিঠি মুছেছি সেটাও আপনি দেখেননি। সেচ্ছায় আপনি চলে গেছেন। যে সেচ্ছায় চলে যায় তার জন্য কষ্ট পেতে হয় না। কিন্তু আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।
আমাকে দেখে যাওয়ার ২দিন পরে রাতে আকাশে প্রচন্ড মেঘ। চারিদিকে অন্ধকার হয়ে আসছে। আমি জানালা বন্ধ করে বসে আছি। হঠাৎ জানালায় কে যেনো ধাক্কা দিলো। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। তারপর ওপাশ থেকে ডাক আসলো,
আনন্দিতা উপমা!
আমি বুঝলাম এই কন্ঠ আপনার। আমি জানালা খুলে দিলাম। টেবিলে মোমবাতি জ্বালালাম। আমি আপনায় বকাঝকা করছিলাম। এভাবে এতো রাতে কে দেখা করতে আসে। আপনি চুপ করে আমার দিকে সেই অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। আপনি কালো রংয়ের শার্ট পরে ছিলেন। চোখে চশমা। মোমবাতির আলো আবচ্ছা আবচ্ছা আপনার মুখে পড়ছে। কি অপূর্ব সুন্দর লাগছিল আপনায়। আপনার হাতটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। আমার মাথায় মুখে হাত বুলিয়ে দিলেন। কি ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো আপনার মনে আছে? আপনি অর্ধেক ভিজে গিয়েছিলেন। তবুও আপনি সেই জানালার ওপাশে দাড়িয়ে রইলেন। আমিও আপনায় আর যেতে বললাম না। কেন যেন মনে হচ্ছিলো আপনায় আমি হারিয়ে ফেলবো। তারপর সেই ঝুম বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আপনি চলে গেলেন। আমি তাকিয়ে রইলাম সেই পথের দিকে। আজ দেখুন আমি সত্যি আপনায় হারিয়ে ফেললাম। আমার ভয়টি সত্য প্রমাণ হলো।
একটি প্রশ্ন আমার মস্তিষ্ক ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। আচ্ছা আপনি আমার থেকে হারিয়ে গেছেন? নাকি আমি আপনায় হারিয়ে ফেললাম?
হঠাৎ করেই শঙ্খ বেজে উঠে। এই প্রথমবার শঙ্খের শব্দ এতো বাজে লাগছে উপমার। উপমা চিৎকার করে উঠে। মনে হচ্ছে তার কান ফেটে যাবে। সে চিঠিটা হাতে নিয়েই দৌড়ে ছাদে চলে যায়। ছাদের সেই কোণায় গিয়ে দাড়ায়। তার পছন্দের জায়গাতে। যেখানে অয়ন বাবুকে প্রথমবারের জন্য সে দেখেছিল। প্রথমবারের মতো ভালোবাসা অনুভব হয়েছিলো। উপমার চোখ দিয়ে অঝরে জলপড়তে থাকে। চিঠিটা সে বাতাসে উড়িয়ে দেয়। এই চিঠিও অয়ন বাবুর কাছে পৌঁছাতে পারলো না। উপমা চোখ গড়িয়ে জল পড়ে। হঠাৎ করে পিছন থেকে কেউ একজন ডেকে উঠে,
আনন্দিতা উপমা !
লেখক: নিশাত রহমান নিশি
দর্শন বিভাগ,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করে গ্রেপ্তারের দাবি এনসিপির

