- ইসলামি নীতিমালা ও আদর্শে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি :৩০ দফা কর্মসূচি ও ১২ বিশেষ উদ্যোগ ঘোষণা করেছে দলটি
নিজস্ব প্রতিবেদক
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ইশতেহারে প্রাধান্য পাবে শরীয়াহ। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৩টায় রাজধানীর পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এ ইশতেহার ঘোষণা করা হয়।
ইশতেহারে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশাা এবং পুরোনো বন্দোবস্ত উৎখাত করে শরিয়াহভিত্তিক নতুন বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইশতেহারে গুরুত্ব পেয়েছে জুলাই সনদের প্রতি দায়বদ্ধতা, তারুণ্যের কর্মসংস্থান, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, নাগরিক সেবা ও অধিকার গুরুত্ব পাবে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আনয়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্মানভিত্তিক বৈদেশিক নীতি।
ইসলামী আন্দোলনের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম ইশেতহার উপস্থাপন করে বলেন, আমাদের ইশতেহারের নামকরণ করা হয়েছে, জনপ্রত্যাশার ইশতেহার। কারণ মহান স্বাধীনতার যুদ্ধ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে যে জনপ্রত্যাশার উম্মেষ ঘটেছে তা রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিফলিত করার অঙ্গিকার নিয়েই আমাদের এই ইশতেহার।
তিনি বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের পরিচালক ও রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ হয়। আর নির্বাচনের আগে ইশতেহারের মাধ্যমে জাতির সামনে দলের নীতি-ভাবনা ও দেশ গঠনের রুপরেখা উপস্থাপন করা হয়। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তার নীতি-ভাবনা ও দেশ গঠনের রুপরেখা ও কর্মসূচি উপস্থাপন করার জন্য এই ইশতেহার পেশ করছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ইশতেহার জাতির সাথে একটি প্রতিজ্ঞা। আপনাদের সমর্থনে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে এই ইশতেহারের প্রতিটি ধারা বাস্তবায়নে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকবে; ইনশাআল্লাহ।
ইশতেহারে রাষ্ট্র গঠনে ইসলামী আন্দোলনেরনীতিগত অবস্থান, রাষ্ট্র সংস্কারে দলটির পরিকল্পনা এবং খাতভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
এতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র গঠনে ইসলামের মৌলিক নীতিমালার মধ্যে রয়েছে আদালত, ইনসাফ, নাগরিকের স্বার্থের প্রতি সংবেদনশীলতা, দায়বদ্ধতা, সামাজিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে এই মৌলিক নীতিমালার পূর্ণ প্রতিপালন করবে।
ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়, একটি ন্যায়ভিত্তিক, নিরাপদ, সুশাসিত ও সাম্যভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে। শাসন ও রাষ্ট্র সংক্রান্ত ইসলামের ধারনায় “ক্ষমতার চর্চা” হয় না বরং “দায়িত্ব পালন” এর মনোভাব প্রধান্য বিস্তার করে। নাগরিকের সাথে শাসকের সম্পর্ক “ক্ষমতার সম্পর্ক”না বরং “দায়িত্ব” এর সম্পর্ক বিরাজ করে। এই নীতিবোধ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হবে এবং দায়িত্ব হস্তান্তরে আগ্রহী দৃষ্টিভঙ্গি লালন করা হবে।রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন, স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা হবে দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলা হবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে পেশাদারিত্ব, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে বাধ্য করা হবে।
রাষ্ট্র গঠনে ইসলামী আন্দোলন ৬ দফা কার্যক্রম উল্লেখ করে। যার মধ্যে রয়েছে- মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতি দায়বদ্ধতা, পিআর পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচন, ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা, সেবাভিত্তিক দক্ষ ও সৎ উন্নত জনপ্রশাসন গড়ে তোলা, রাজস্ব সম্প্রসারণ ও স্বনির্ভর শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক ডিফেন্স সিস্টেম গড়ে তোলা।
সংবাদ সম্মেলেন মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম ইশতেহারের সারাংশ তুলে ধরেন।
১. দেশের স্থায়ী শান্তি ও মানবতার সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন।
২. দুর্নীতি, দুঃশাসন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদকমুক্ত কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
৩. সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সুশাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা।
৪. রাষ্ট্রপরিচালনায় সর্বত্র শরীয়াহ’র প্রধান্য।
৫. কৃষি ও শিল্পবিপ্লব ঘটিয়ে বেকার ও দারিদ্র্যমুক্ত এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশালী দেশ গঠন।
৬. নৈতিকতায় সমৃদ্ধ কর্মমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা।
৭. সার্বজনীন কর্মসংস্থান।
৮. পর্যায়ক্রমিক রাষ্ট্রসংস্কার।
৯. মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশার প্রতি দায়বদ্ধতা।
১০. আর্থিক, সামরিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি।
১১. নারী, শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকারসহ সকল জনগোষ্ঠীর মৌলিক ও মানবাধিকারের সুরক্ষা।
১২. রাষ্ট্র-সমাজ ও অর্থনীতিতে বৈষম্য বিলোপ।
১৩. সকলের জন্য সাশ্রয়ী ও উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা।
১৪. পরিবেশ দূষণ রোধ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু অভিঘাত মোকাবিলায় গুরুত্ব।
১৫. ধর্মীয় স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সহাবস্থান।
১৬. শুধু দুর্নীতি-সন্ত্রাস দমন নয়; নির্মূলকরণ কর্মসূচিও গ্রহণ করা হবে।
১৭. শুধু আইনের শাসন নয়; ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা।
১৮. জনমতের যথার্থ প্রতিফলন, সুষ্ঠু নির্বাচন ও কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠায় পিআর (Proportional Representation) পদ্ধতি বাস্তবায়ন।
১৯. মানুষের সার্বিক কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় ধর্ম ও রাজনীতির সমন্বয় করা।
২০. দুর্নীতি, সন্ত্রাস, খুন ও অনৈতিক পেশার সাথে জড়িতদের রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করণ।
২১. খুন, গুম, মিথ্যা, গায়েবী মামলা, জুলুম, নির্যাতন ও দুঃশাসনের বিলোপ।
২২. জনগণের বাক-স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
২৩. নারীদের শুধু সমঅধিকার নয়; অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠা করা হবে।
২৪. শিল্পোদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদান, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, স্যুয়ারেজ, আমদানী-রফতানী কার্যক্রমে ওয়ানস্টপ সার্ভিস কর্মসূচি গ্রহণ।
২৫. সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করা।
২৬. কওমি মাদরাসায় ডিগ্রীধারীসহ দক্ষ ও যোগ্য ওলামায়ে কিরামকে সরকারী সুযোগের আওতাভূক্ত করা।
২৭. সড়ককে নিরাপদ করার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
২৮. বাংলাদেশকে ১৫ বছরের মধ্যে উন্নত ও কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করা।
২৯. শ্রমের মর্যাদা ও শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা।
৩০. দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি রোধকল্পে সকল সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দেয়া।
১২টি বিশেষ কর্মসূচি
১. হতদরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা নগদ সহায়তা।
২. প্রাথমিক স্তরের সকল শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিদিন একবেলা পুষ্টিকর খাবার।
৩. ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী যুবকদের জন্য সুদমুক্ত ও জামানতবিহীন এককালীন ঋণ।
৪. সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি বা স্বাস্থ্যকার্ড চালু, ভর্তুকিমূল্যে কৃষি উপকরণ সরবরাহ এবং কৃষিকার্ড প্রবর্তন।
৫. ন্যাশনাল জব পোর্টাল, যেখানে দেশে ও বিদেশে চাকরি খোঁজা, পরামর্শ ও প্রশিক্ষণের সুবিধা থাকবে।
৬. কর্মজীবী মায়েদের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন।
৭. ঢাকাসহ সকল নগরে সরকার নিয়ন্ত্রিত ও ফ্র্যাঞ্চাইজভিত্তিক বাস ব্যবস্থাপনা।
৮. সেবাকেন্দ্রিক কর ব্যবস্থা চালু।
৯. সকলের জন্য নির্বিঘ্ন নাগরিক সেবা নিশ্চিতকরণ।
১০. নারী পোশাকশ্রমিকদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা।
১১. দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে অবৈধ সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া।
১২. কওমি সনদের স্বীকৃতির পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রীয় পদে ওলামায়ে কেরামের পদায়ন।