মো. মনিরুল ইসলাম
মিডিয়া বা গণমাধ্যম সমাজর দর্পন যা গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার আদায়ের মূল হাতিয়ার। গণমাধ্যম হেরে গেলে, হেরে যায় গোটা জাতি ও দেশের সুশাসন ব্যবস্থা।
ডিজিটাল যুগে তথ্যের প্রবাহ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে বিভ্রান্তি ও ভুয়া তথ্যের বিস্তার। বাংলাদেশেও এই প্রবণতা স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায় যার প্রভাব থেকে মুক্ত নয় বাঙালি জাতি। ফলে সাংবাদিকতার পেশাগত মান, নৈতিকতা, দক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। একটি জাতির সমস্যা নিরসনে সংবাদপত্র ও মিডিয়ার ভূমিকা অনন্য যার জন্য নৈতিকতা ও দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। দিন দিন সমস্যা বেড়েই যাচ্ছে, মোকাবিলা করতে হচ্ছে ভয়ংকর কিছু চ্যালেঞ্জের যা সকল পেশায় তৈরি করছে অনাস্থা ও অস্থিতিশীল পরিবেশ।
এই পরিস্থিতি শুধু গণমাধ্যমের জন্য নয়, বরং পুরো সমাজের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই মুহুর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সংকটের মধ্যে অন্যতম সংকটজনক দিকগুলো হলো-
১. ভিউ বিজিনেস: অনলাইন মিডিয়ার দ্রুত রিচ ও ভিউ ব্যবসা সাংবাদিকতার মানগত অবনতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। স্বল্প খরচে অনলাইন নিউজ পোর্টাল তৈরি করা সহজ হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব ছাড়াই নামে বেনামে অবৈধভাবে সংবাদ প্রতিবেদনের কাজ করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই ছাড়াই খবর প্রকাশের প্রবণতা বাড়ছে গাণিতিকধারায়, যা ভুল তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করছে।
২. হলুদ শিরোনাম: “ক্লিকবেইট সাংবাদিকতা” বর্তমানে একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য অনেক সময় শিরোনামকে অতিরঞ্জিত বা বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করা হয়, যা মূল তথ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় উল্টো বিভ্রান্তি ও মানহানিকর। এতে করে পাঠকের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং গণমাধ্যমের প্রতি আস্থা কমে যায়।
৩. প্রশিক্ষণ ও নৈতিকতার অভাব: সাংবাদিকদের পেশাগত প্রশিক্ষণের অভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক নতুন সাংবাদিক পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ বা নীতি নৈতিকতার নির্দেশনা ছাড়াই পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। ফলে তারা তথ্য যাচাই, সূত্র ব্যবহারের নীতি, এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে দুর্বলতা মনে করেন।
৪. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব: বর্তমানে অনলাইন প্লাটফর্মগুলো সহজতর হয়ে এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। যেমন: ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যে কেউ সহজেই তথ্য প্রকাশ করতে পারছেন, যা একদিকে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ বাড়ালেও অন্যদিকে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে। অনেক সময় মূলধারার গণমাধ্যমও এই অযাচাইকৃত তথ্যের প্রভাবে পড়ে যায়। তবে এই সমস্যার সমাধান অসম্ভব নয়।
৫. তথ্য যাচাইয়ের অভাব (Lack of Fact-Checking):
সাংবাদিকতার মূল ভিত্তিই হলো সঠিক ও নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করা, প্রচার করা ও পরিবেশনে ভূমিকা রাখা। কিন্তু অদক্ষ ও অনৈতিকতার ফলে সাংবাদিকরা অনেক সময় তথ্য সংগ্রহের পর তা যথাযথভাবে যাচাই না করেই প্রকাশ করে ফেলেন। এর পেছনে কয়েকটি কারণ হতে পারে। যেমন: দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতা, পর্যাপ্ত দক্ষতার অভাব, কিংবা পেশাগত দায়িত্ববোধের ঘাটতি, অন্যটি পক্ষপাতিত্ব হওয়া।
মূলত এসব কারণে মিথ্যা সংবাদ (Fake News) ছড়িয়ে পড়ে সোশাল মিডিয়াগুলোতে যা সাধারণ মানুষ তা সত্য বলে ধরে নেয়। ফলে সংঘর্ষ ও হিংসা বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ে দ্রুতগতিতে। আর এসব কারণেই জনসমাজে তৈরি হয় গুজব ও আতঙ্ক।
৬. যাচাই বাছাই করার সক্ষমতা (Weak Analytical Skills):
একজন পেশাদার ও দক্ষ সাংবাদিকের কাজ শুধু তথ্য দেওয়া নয়, বরং সেই তথ্যের গভীরতা, প্রেক্ষাপট এবং প্রভাব বিশ্লেষণ করে পাঠকের সামনে চমৎকারভাবে তুলে ধরা। কিন্তু অদক্ষতার কারণে অনেক সাংবাদিক এই বিশ্লেষণী দিকটি উপেক্ষা করেন। অদক্ষের পিছনে রয়েছে বেতনবৈষম্য ও মালিকপক্ষের সদিচ্ছা। এসকল চ্যালেঞ্জ দিন দিন বাড়ছে। জনসমক্ষে উক্তা পেশার প্রতি তৈরি হচ্ছে অনীহা ও অনিচ্ছা।
কারণ, মানুষ ফটো কার্ড দেখে নিউজে ক্লিক করলেই ভিতরে তথ্য থাকে সম্পূর্ন বিপরীত। এতে
মানুষ যখন পূর্ণাঙ্গ তথ্য পায় না, তখন তারা ভুল বা অসম্পূর্ণ ধারণার ভিত্তিতে মতামত মনে করে নেয়।
যেমন: সম্প্রতি ভূয়া ফটো কার্ড নিয়ে বৃহত্তম দুটো ছাত্র সংগঠন শিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে ধাওয়া ও পাল্টা ধাওয়া চলে যা রাজনীতি ও দেশের মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে।
এর জন্য কিছু পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
প্রথমত, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের নিজস্ব মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি স্বচ্ছ চিন্তা ও নিরপেক্ষ থাকার ভূমিকা রাখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সাংবাদিকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা বিষয়ে সচেতন ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করতে হবে।
তৃতীয়ত, তথ্য যাচাই (fact-checking) ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে হবে এবং প্রযুক্তির সহায়তা নিতে হবে। সময়োপযোগী কিছু টুলস সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে যাতে করে কোনটা সঠিক আর কোনটা বেঠিক এগুলো খুব সহজেই চিহ্নিত করা যায়।
সবশেষে, পাঠকদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। কারণ একটি দায়িত্বশীল সমাজ গড়ে তুলতে হলে শুধু সাংবাদিকদের নয়, পাঠকদেরও তথ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে।
সুতরাং, তথ্যের এই যুগে সাংবাদিকতার মান বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও, সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
লেখক: আইন শিক্ষার্থী ও তরুণ গবেষক
