তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে উন্নয়নের পথে বাংলাদেশের যাত্রায় রিসার্চের শক্তি

মো. সায়েদুর রহমান


হেনরি কিসিঞ্জার– যে একবার এই কালিমা দিয়ে গিয়েছিলেন, তার কারনেই এক সময় বাংলাদেশকে বলা হতো “তলাবিহীন ঝুড়ি”। দুইটি মাত্র শব্দ কোন উপমা ছিল না, বরং একটি গভীর আন্তর্জাতিক অবিশ্বাসের প্রতিফলন আজও ইতিহাসের অংশ।

মাত্র স্বাধীন হওয়া একটি দেশ, দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠী, ভঙ্গুর অর্থনীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা- সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে ঘিরে তখন হতাশাই ছিল প্রধান অনুভূতি। অথচ সময়ের ব্যবধানে দৃশ্যপট বদলেছে। আজ বাংলাদেশে দালানকোঠা উঠছে, প্রযুক্তির বিস্তার ঘটছে, অবকাঠামো বিস্তৃত হচ্ছে, অর্থনীতি সম্প্রসারিত হচ্ছে, মানুষের জীবনমান ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই রেভ্যুলেশনারি পরিবর্তন এর আসল শক্তি কী?

কেবল অবকাঠামো, নাকি এর পেছনে আছে আরও গভীর কোনো চালিকাশক্তি? প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গেলে শেষ পর্যন্ত যে শব্দটির কাছে ফিরে আসতে হয়, সেটি হলো রিসার্চ বা গবেষণা


সেদিন ক্লাস শেষে এক শিক্ষার্থী এসে খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন করেছিল। সে জানতে চেয়েছিল, প্রায় বিশ থেকে পঁচিশ বছর আগে মালয়েশিয়া তো বাংলাদেশের চেয়েও পিছিয়ে ছিল, তাহলে আজ তারা এত এগিয়ে গেল কীভাবে? প্রশ্নটি সহজ মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল উন্নয়নের দর্শন। আমি তখন এক শব্দেই উত্তর দিয়েছিলাম- রিসার্চ। কিন্তু শিক্ষার্থীর চোখে যে বিস্ময় দেখেছিলাম, তাতে বুঝেছিলাম, এই শব্দটির গভীরতা আমরা নিজেরাই অনেক সময় উপলব্ধি করতে পারি না। এই লেখিনী সেই শব্দটির অর্থ, প্রভাব ও সম্ভাবনা ব্যাখ্যা করারই একটি চেষ্টা।

আমরা জন-সাধারণত উন্নয়ন বলতে চোখের সামনে দেখা বিষয়গুলোকে বুঝি- উঁচু ভবন, প্রশস্ত রাস্তা, বড় সেতু, শিল্পকারখানা, পার্ক রেস্তোরাঁ। কিন্তু এগুলো উন্নয়নের দৃশ্যমান রূপ মাত্র। এর পেছনে যে অদৃশ্য ভিত্তি কাজ করে, সেটিই প্রকৃত উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। সেই ভিত্তির নাম জ্ঞান, গবেষণা এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। একটি রাষ্ট্র যখন অনুমানের বদলে প্রমাণকে গুরুত্ব দেয়, আবেগের বদলে বিশ্লেষণকে প্রাধান্য দেয়, তখনই উন্নয়ন টেকসই হয়।

মালয়েশিয়ার অল্প সময়ের পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা এই সত্যটিই সামনে আনে। নব্বইয়ের দশকে দেশটি বুঝতে পেরেছিল, কেবল সস্তা শ্রম বা প্রাকৃতিক সম্পদ বা ভৌগলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী করা যাবে না। তাই তারা পরিকল্পিতভাবে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও গবেষণায় বিনিয়োগ শুরু করে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়। শিল্পখাতের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংযোগ তৈরি করা হয়, যাতে গবেষণার ফল বাস্তব অর্থনীতিতে ও জীবনে কাজে লাগে। বাস্তবতা নিরিখে থিওরি আলোচনা হয়, কোন খাতে বিনিয়োগ করলে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, কোন প্রযুক্তি ভবিষ্যতে টিকে থাকবে- এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে গবেষণার মাধ্যমে।

শুধুমাত্র গবেষণাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির ফলেই মালয়েশিয়ার অর্থনীতি ধীরে ধীরে বহুমুখী হয়েছে, এ মালয়েশিয়া সকল শিক্ষাবিদ বিশ্বাস করেন। তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স-ইলেকট্রনিক্স, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ও জ্ঞানভিত্তিক শিল্পে অগ্রসর হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষকে রেখেছে। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা হয়েছে, যারা শুধু কাজ করে না, চিন্তাও করে। এটাই গবেষণার আসল শক্তি- এটি মানুষকে কেবল শ্রমিক নয়, চিন্তাশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা আরও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার ৫৪ বছর যাবত বাংলাদেশ অনেক লড়াই পেরিয়ে এসেছে। দারিদ্র্য হ্রাস, খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, রপ্তানি খাতে সাফল্য- এসব অর্জন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের উন্নয়নের একটি সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। আমরা এখনও জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারিনি। আমাদের উন্নয়নের বড় অংশ অবকাঠামো ও শ্রমনির্ভর। গবেষণা ও উদ্ভাবনের ভূমিকা এখনও তুলনামূলকভাবে অনেক দুর্বল।

গবেষণায় বিনিয়োগ কম হলে উন্নয়ন কিছু সময় এগোলেও একসময় গতি হারায়। কারণ তখন উৎপাদনশীলতা বাড়ে না, প্রযুক্তি আমদানি নির্ভর হয়ে পড়ে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দেশ পিছিয়ে যায়। অনেক দেশ এই অবস্থায় মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে গেছে। তারা আর গরিব থাকে না, কিন্তু উন্নত দেশেও পৌঁছাতে পারে না। এই ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হলো গবেষণা ও উদ্ভাবন।
রিসার্চ আসলে শুধু থিওরি আর অর্থনীতির বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার একটি দর্শন। কোন শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তব দক্ষতা তৈরি করে, কোন স্বাস্থ্যনীতি দীর্ঘমেয়াদে ব্যয় কমায়, কোন সামাজিক নীতি স্থিতিশীলতা আনে- এসব প্রশ্নের উত্তর গবেষণা ছাড়া পাওয়া যায় না। গবেষণা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, আর প্রশ্ন করার ক্ষমতাই একটি জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

বাংলাদেশে মেধার অভাব নেই। আমাদের শিক্ষার্থীরা বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে গবেষণায় সাফল্য দেখাচ্ছে। সমস্যা হলো, দেশে সেই মেধাকে কাজে লাগানোর কাঠামো এখনও দুর্বল। গবেষণাকে আমরা এখনও অনেকাংশে বিলাসিতা বা অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে দেখি। ফলে নীতি নির্ধারণে গবেষণার প্রভাব সীমিত থাকে। অথচ ইতিহাস প্রমাণ করেছে, গবেষণায় বিনিয়োগই সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ।

এক সময় আমাদের বলা হতো তলাবিহীন ঝুড়ি। আজ আমরা দালানকোঠার দেশ হওয়ার পথে। কিন্তু শুধু দালানকোঠা দিয়ে উন্নয়নের গল্প শেষ হয় না। যদি এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে চাই, যদি সত্যিই একটি সম্মানজনক, জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে চাই, তাহলে আমাদের উন্নয়নের ভাষা বদলাতে হবে। সেই ভাষার নাম রিসার্চ।

সেদিন শিক্ষার্থীকে দেওয়া এক শব্দের উত্তরের ভেতরে আসলে একটি জাতির ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে। তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে দালানকোঠার পথে যাত্রা সম্ভব- কিন্তু সেই পথের আসল শক্তি ইট-পাথর নয়, বরং গবেষণা, জ্ঞান এবং প্রশ্ন করার সাহস।


লেখকঃ মো. সায়েদুর রহমান,

সহযোগী অধ্যাপক, ব্যাবসায় প্রশাসন বিভাগ, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি সিলেট।