মো. সায়েদুর রহমান।
বাংলাদেশ আজ আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘবছরের বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনী অভিজ্ঞতার পর দেশের জনগণ এবার প্রত্যাশা করছে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। এই প্রত্যাশার কেন্দ্রে রয়েছে একটি বহুল আলোচিত বিষয়-‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ। এই পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে নির্বাচন শুধু একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হবে, যার সঙ্গে গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনার কোনো মিল থাকবে না।
নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নয়; এটি জনগণের মতামত প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। এই মাধ্যমের মাধ্যমে জনগণ তাদের পছন্দের নেতৃত্ব নির্বাচন করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করে। কিন্তু যদি এই প্রক্রিয়া ভয়, চাপ, প্রভাব কিংবা বৈষম্যের মধ্যে আবদ্ধ থাকে, তবে ভোটাধিকার অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাই নির্বাচনের মাঠ সবার জন্য সমান না হলে জনগণের আস্থাও নষ্ট হয়ে যায়। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলতে এমন একটি পরিবেশকে বোঝায়, যেখানে সব রাজনৈতিক দল ও প্রার্থী সমান সুযোগ, নিরাপত্তা ও অধিকার ভোগ করবে। কোনো পক্ষ রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় এগিয়ে যাবে না, আবার কাউকে কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হবে না। নির্বাচন হবে প্রতিযোগিতামূলক, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য- এটাই এর মূল লক্ষ্য।
একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা। প্রশাসনের সামান্য পক্ষপাতও পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের তা বারবার দেখিয়েছে। সব দলের সভা-সমাবেশে সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া, রাজনৈতিক চাপের বাইরে থেকে দায়িত্ব পালন করা- এসবই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মৌলিক শর্ত। প্রশাসন যদি জনগণের আস্থা হারায়, তাহলে নির্বাচন কমিশনের সব উদ্যোগই ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে।
গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। একটি স্বাধীন, সাহসী ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমই পারে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ রাখতে। সাংবাদিকরা মাঠে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন, অনিয়ম তুলে ধরেন এবং জনগণের সামনে বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিকদের ওপর যেভাবে ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনা ঘটছে, তা গভীর উদ্বেগের কারণ। আজ যেভাবে সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ চালানো হয়েছে, তা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ওপর হামলা নয়; এটি মূলত স্বাধীন সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারের ওপর সরাসরি আঘাত। এই ধরনের হামলার উদ্দেশ্য খুবই স্পষ্ট- নির্বাচনী সময়ে যাতে প্রকৃত ঘটনা গণমাধ্যমে উঠে না আসে, যাতে অনিয়ম ও সহিংসতা আড়ালেই থেকে যায়। সাংবাদিকদের ভয় দেখিয়ে, নিরুৎসাহিত করে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চলছে। এটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের পরিপন্থী এবং গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে অবাধ সংবাদ কাভারেজ সম্ভব নয়। আর সংবাদ কাভারেজ বাধাগ্রস্ত হলে জনগণ প্রকৃত তথ্য থেকে বঞ্চিত হবে। ফলে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রশ্নের মুখে পড়বে।
নির্বাচনী সময়ে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভুয়া তথ্য, গুজব ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন এই অপপ্রচারের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে। এর পাশাপাশি কিছু উগ্র ও হঠকারী কর্মীর সহিংস প্রস্তুতি পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলছে। অস্ত্র প্রদর্শন, কেন্দ্র দখলের মহড়া কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা নির্বাচনকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। এসব বিষয়ে আগাম ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ ও কার্টার সেন্টারের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার বলে আসছে- নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার মূল ভিত্তি হলো সমান আইন প্রয়োগ এবং ভোটারদের নিরাপত্তা। ভোটার যেন নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন, প্রার্থী যেন বাধাহীন প্রচারণা চালাতে পারেন, সাংবাদিক যেন অবাধে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন- এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত না হলে কোনো নির্বাচনই আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য হয় না। বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রশ্ন নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
গত এক যুগের বেশি সময় ধরে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনগুলো জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন করেছে। মানুষ আর রাতের ভোট, ফাঁকা কেন্দ্রে বিজয় কিংবা একতরফা নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না। আজ মানুষ চায়- তার ভোটের মূল্য থাকুক, তার কণ্ঠস্বর প্রতিফলিত হোক, তার সিদ্ধান্ত সম্মানিত হোক। বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে, যা প্রশংসার যোগ্য। তবে এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করতে হবে। তবে আরও প্রয়োজন- রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন, সাংবাদিকদের পূর্ণ নিরাপত্তা, প্রতিটি কেন্দ্রে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সিসিটিভি ও প্রযুক্তিগত নজরদারি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, এবং সন্ত্রাস ও সহিংসতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। বিশেষ করে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের দুঃসাহস দেখাতে না পারে।
একটি সুষ্ঠু নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটায় না; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে। সঠিক নেতৃত্ব নির্বাচিত হলে প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সহজ হয়। গণতন্ত্রের জন্য যারা জীবন দিয়েছেন, যারা আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন- তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব হলো একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
আজ সময় এসেছে প্রমাণ করার- বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থেই সমান মাঠে গণতন্ত্রের চর্চা করতে সক্ষম। সাংবাদিকের কলম ও ক্যামেরা যেন ভয়ে থেমে না যায়, ভোটারের হাত যেন কাঁপে না,
প্রার্থীর কণ্ঠ যেন রুদ্ধ না হয়- এই নিশ্চয়তাই একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের প্রকৃত অর্থ। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই পারে জাতিকে নতুন আশার পথে এগিয়ে নিতে।
লেখক: মো. সায়েদুর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক,
ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ,
মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি সিলেট।
(বিঃদ্রঃ – লেখাটি লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব মতামত, এখানে সংশ্লিষ্ট পত্রিকা বা সম্পাদকের কোনো দায় নেই)
আওয়ামী লীগ বাদে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না: সিপিডি
বৈষম্যের রাজনীতি ভেঙে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার অঙ্গীকার নাহিদ ইসলামের
আপনারা মজলুম ছিলেন, জালিম হবেন না : বিএনপিকে ইঙ্গিত করে শফিকুর রহমান


আপনারা মজলুম ছিলেন, জালিম হবেন না : বিএনপিকে ইঙ্গিত করে শফিকুর রহমান