মো. মনিরুল ইসলাম
গণমাধ্যম একটি দেশ ও বিশ্বের দর্পন হিসেবে কাজ করে থাকে। বাংলাদেশেও গণমাধ্যমের ভূমিকা আকাশচুম্বী। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষায় গণমাধ্যমকে দীর্ঘদিন ধরে “ফোর্থ পিলার” হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অপরদিকে বাস্তবতায় এটি নানা ধরনের চাপ ও সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে চলছে। বিশেষ করে, মত ও সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা—এই দুই ক্ষেত্রেই সাংবাদিকদের সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান।
ফলে, সত্য তুলে ধরার প্রক্রিয়া অনেক সময় বাধাগ্রস্ত হয়, যা গণতন্ত্রের জন্য সব সময়ই হুমকিস্বরূপ। আমরা সভা সমাবেশে সংবাদ সংগ্রহকালীন সময়ে হামলার ঘটনাও কম নয়। বিশেষ করে গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার আদায়ের যে কোন আন্দোলনে। সংবাদিকদের চ্যালেঞ্জ বিষয়ে সিনিয়র ১০ জন সাংবাদিকদের থেকে মাঠ পর্যায়ে ফিল্ড ওয়ার্ক করলে তারাও নানান সমস্যা ও চ্যালেঞ্জগুলো শেয়ার করেছেন যা একটি দেশের অগ্রগতি ও গণতন্ত্রকে দমিয়ে রাখার জন্য প্রাচীর হয়ে দাড়ায়। চ্যালেঞ্জ ও সমস্যাবলীর মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাব, ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠা, ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল, সাংবাদিকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণন ও বেতনের অভাব পাশাপাশি কিছু বৈষম্য রয়েছে। এরকমভাবে বিভিন্ন বিষয়ে তারা সামনে নিয়ে আসছে। তাদের মধ্যে ককয়েকটিমাত্র গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা উল্লেখ করা হলো-
১. রাজনৈতিক চাপ: রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ বাংলাদেশের সাংবাদিকতার স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হিসেবে প্রথার মতো চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। বিভিন্ন সময় দেখা যায়, ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ করলে সাংবাদিকরা হুমকি, হয়রানি বা পেশাগত অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয়। এতে করে অনেক সাংবাদিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করতে নিরুৎসাহিত হয়ে থাকে। এর ফলে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় যথাযথভাবে উঠে আসে না। উল্টো অপরাধীদের হাত শক্তিশালী হয়।
২. আইনের চাপ: বাংলাদেশের আইনি কাঠামোর দিক থেকেও সাংবাদিকদের জন্য একটি দ্বিমুখী বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন আইন একদিকে সাইবার অপরাধ দমনের উদ্দেশ্যে গঠিত হলেও, অন্যদিকে এসব আইনের প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সীমাবদ্ধতা তৈরি করছে বলে প্রশ্ন রয়েছে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে। অনেক সাংবাদিকবৃন্দ অভিযোগ করেন, এই ধরনের আইনি ঝুঁকি তাদেরকে আত্মনিয়ন্ত্রণে (self-censorship) বাধ্য করে, ফলে তারা পূর্ণ সত্য প্রকাশ করতে পারেন না বলে আপত্তি রয়েছে।
৩. লোকাল প্রভাব বিস্তার: প্রান্তিক জনগণ ও মাঠপর্যায়ে কাজ করা সাংবাদিকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকির মধ্যে কাজ করেন। স্থানীয় ক্ষমতাকেন্দ্র, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কিংবা প্রশাসনিক চাপ তাদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেই, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
৪. আন্তর্জাতিক চাপ: আধিপত্যবাদের ভয়ে সবসময় গণমাধ্যম কর্মীরা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অনিরাপদজনিত কারণে পেশাগত স্বাধীনতার খর্ব হয়।
৫. মালিকানাগত চাপ (Ownership influence):
দীর্ঘ সময় ধরে অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিকদের ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করে আসছে। এই স্বার্থ রক্ষার জন্য সংবাদ প্রকাশে গভীর চাপ তৈরি হয়।
ফলে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা পুরোপুরি কার্যকর থাকে না। বাধ্য হয়ে পক্ষপাতিত্ব কাজে আটকে থাকতে হয়। অনেক গুরুত্বপূর্ণ খবর ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ পড়ে বা পরিবর্তিত হয়ে প্রকাশিত হয়, যা সাংবাদিকতার মূল নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও নৈতিকতা বিবর্জিত।
বিভিন্ন সূচকেও বাংলাদেশের সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। যদিও এসব সূচক নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবুও এগুলো একটি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেশের অবস্থানকে তুলে ধরে এবং সমস্যাগুলোকে আলোচনায় নিয়ে আসে।
তবে এই সংকটের মধ্যেও ইতিবাচক দিক রয়েছে। অনেক সাংবাদিক এখনও পেশাগত নৈতিকতা বজায় রেখে সাহসিকতার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন। উদাহরণ হিসেবে বললে- অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে কাজ করার প্রবণতা এখনও বিদ্যমান, যা আশার আলো দেখায়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে অযৌক্তিক হয়রানি বন্ধ করা। রাজনৈতিক দল, সংস্থা ও ব্যবসায়ীদের থেকে উৎসাহ অনুপ্রেরণা পেলে তাদের এই সমস্যা ও মোকাবিলাও রোধ করা সম্ভব।
এরপরে, আইনি কাঠামোকে এমনভাবে সংস্কার করতে হবে যাতে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত না করে বরং সুরক্ষা দেয়। পাশাপাশি সাংবাদিক ও আইনশৃঙ্খলা একই পৃষ্ঠে মোড়ানো এমন মনোভাব পোষণ করা আবশ্যকীয়।
পরিশেষে, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে স্বাধীনতা ও পেশাগত মান বজায় রাখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। যাতে করে একটি গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাধীন সাংবাদিকতা অপরিহার্য হয়ে উঠে। এজন্য ভিউ বিজিনেস, তথ্য পাচার, অবৈধ লেনদেন এবং অনৈতিকতাও রুখে দিতে হবে। তবেই একটি গণমাধ্যম পাবে স্বাধীনতা আর দেশ পাবে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততা।
তাই বাংলাদেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প এবং অন্য কোন দ্বিতীয় মাধ্যম নেই।
লেখক: আইন শিক্ষার্থী ও তরুণ গবেষক
