সোহাগী জাহান তনু | ছবি: সংগৃহীতসোহাগী জাহান তনু | ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক

দীর্ঘ এক দশক পেরিয়েও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার রহস্য পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। তবে তদন্তের নতুন অগ্রগতিতে আবারও আলোচনায় এসেছে বহুল আলোচিত এই হত্যাকাণ্ড। এবার তনুর আলামত থেকে আরও এক অজ্ঞাত পুরুষের রক্তের নমুনা পাওয়ার তথ্য জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

এর আগে সিআইডি তনুর পোশাক থেকে সংগ্রহ করা নমুনার ডিএনএ পরীক্ষায় তিন পুরুষের শুক্রাণুর উপস্থিতির কথা জানিয়েছিল। এবার নতুন করে আরও একজন পুরুষের রক্তের আলামত শনাক্ত হওয়ায় তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।

রবিবার (১৭ মে) রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, পিবিআই ঢাকা কার্যালয়ের পরিদর্শক তারিকুল ইসলাম।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘আগে তিন পুরুষের শুক্রাণু তথ্য আমাদের কাছে ছিল। এখন নতুন করে আরও একজন পুরুষের আলামত পাওয়ার তথ্য ডিএনএ ল্যাব থেকে আমাদের দেওয়া হয়েছে।’

পিবিআই সূত্র জানায়, গত ৬ এপ্রিল মামলায় তিন সন্দেহভাজন— সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান ও সৈনিক শাহিনুল আলমের ডিএনএ নমুনা ক্রস-ম্যাচ করার জন্য আদালতে আবেদন করা হয়।

আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পর গত ২১ এপ্রিল রাতে ঢাকার কেরানীগঞ্জের নিজ বাসা থেকে হাফিজুর রহমানকে আটক করা হয়। পরে তাকে তনু হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের জন্য ঢাকায় নেওয়া হয় এবং পরদিন বিকেলে কুমিল্লার আদালতে হাজির করা হলে আদালত তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

সিআইডির ডিএনএ ল্যাবরেটরি অব বাংলাদেশ পুলিশের ডিএনএ পরীক্ষক নুসরাত ইয়াসমিনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়, সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মোট ২৪টি আলামত পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল নিহত তনুর কালো, লাল ও হলুদ প্রিন্টের কামিজ, বেগুনি রঙের ওড়না, কালো সালোয়ার, লাল ও হালকা বেগুনি রঙের অন্তর্বাস, চারটি দাঁত, ভ্যাজাইনাল সোয়াব, ৫ ফুট ও ১০ ফুট লম্বা খাকি ও হলুদ টেপ, পুরুষের একজোড়া ছেঁড়া জুতা, বলপেন ও এক টুকরো কাপড়। এছাড়া বাকি ১৩টি নমুনা ছিল সন্দেহভাজন ১৩ ব্যক্তির ডিএনএ প্রোফাইল।

নুসরাত ইয়াসমিনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওড়না, সালোয়ার ও আন্ডারওয়্যারে মানুষের বীর্যের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। এসব আলামতের বিভিন্ন স্থানে তিন জন ভিন্ন ভিন্ন পুরুষের পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া যায়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এক টুকরো কাপড়ে রক্তের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। সেখানে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া গেছে। তবে এই ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে সালোয়ার, ওড়না ও আন্ডারওয়্যারে পাওয়া বীর্যের কোনো মিল নেই।

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, নতুন করে আরও একজন পুরুষের রক্তের আলামত পাওয়ায় তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও মামলাটির তদন্ত তদারকি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘মামলার তদন্তে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। সবকিছু এখনই বলার সময় আসেনি। এখন নতুন করে আরও একজনের রক্ত পাওয়ায় সন্দেহভাজনদের সঙ্গে আরও ৩ জনের ডিএনএ ম্যাচ করাতে হবে। ইতিপূর্বে একজনের (হাফিজুর) ডিএনএ নমুনা নেওয়া হয়েছে।’

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করাতে গিয়ে আর বাসায় ফেরেননি তনু। পরে বহু খোঁজাখুঁজির পর সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের অদূরে জঙ্গলের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় তার মরদেহ। পরদিন তার বাবা ইয়ার হোসেন অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

ঘটনার পর থানা পুলিশ, জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দীর্ঘ সময় তদন্ত করেও হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি।

তবে ২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি তনুর পোশাক থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষায় তিন পুরুষের শুক্রাণুর উপস্থিতির তথ্য গণমাধ্যমকে জানায়।

সবশেষে, ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর পুলিশ সদরদফতরের নির্দেশে তনু হত্যা মামলার নথি সিআইডি থেকে পিবিআই সদরদফতরে হস্তান্তর করা হয়। গত প্রায় চার বছর মামলাটি তদন্ত করেন পিবিআই সদরদফতরের পুলিশ পরিদর্শক মজিবুর রহমান। পরে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মামলাটির ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান পরিদর্শক তারিকুল ইসলাম।