ছবি : নেত্রদর্পণ কোলাজছবি : নেত্রদর্পণ কোলাজ

মো. সাইয়েদুর রহমান পলাশ

ইসলাম একটি ভারসাম্যের ধর্ম। এখানে যেমন সন্তানের ওপর বাবা-মায়ের অধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে, তেমনি বাবা-মায়ের ওপরও সন্তানের অধিকার ও দায়িত্ব স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। অনেক সময় সমাজে এমন ধারণা তৈরি হয় যে কেবল সন্তানদেরই বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্য রয়েছে। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা একতরফা নয়; বরং এটি পারস্পরিক দায়িত্ব, ভালোবাসা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সন্তানদের নির্দেশ দিয়েছেন, তারা যেন বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করে, তাদের প্রতি বিনয়ী হয় এবং বৃদ্ধ বয়সে তাদের অবহেলা না করে। আল্লাহ বলেন, “তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন বা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ পর্যন্ত বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।” (সূরা আল-ইসরা: ২৩)

রাসূলুল্লাহ (সা.)-ও বারবার বাবা-মায়ের মর্যাদা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, “পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।” (তিরমিযি)

কিন্তু একই সঙ্গে ইসলাম বাবা-মায়ের ওপরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেছে। সন্তানকে জন্ম দেওয়া শুধু একটি জৈবিক প্রক্রিয়া নয়; বরং তাকে ঈমান, নৈতিকতা, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও স্নেহের পরিবেশে বড় করে তোলাও একটি আমানত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (বুখারি ও মুসলিম)

ইসলামি শিক্ষায় বাবা-মায়ের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে সন্তানের জন্য সুন্দর নাম নির্বাচন করা, তাকে হালাল উপার্জনে লালন-পালন করা, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা, তার চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখা এবং সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার বজায় রাখা। কোনো সন্তান যদি ছোটবেলা থেকে অবহেলা, নির্যাতন, বৈষম্য বা সঠিক শিক্ষার অভাবে বেড়ে ওঠে, তাহলে সেই ক্ষতির একটি অংশের দায় বাবা-মায়ের ওপরও বর্তায়।

অর্থাৎ ইসলাম এমন একটি পরিবারব্যবস্থা চায় যেখানে বাবা-মা সন্তানকে ভালোবাসা ও দায়িত্ব দিয়ে বড় করবেন, আর সন্তান বড় হয়ে সেই বাবা-মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা, সম্মান ও সেবার মাধ্যমে প্রতিদান দেবে। এই চক্রের কোনো এক অংশ ভেঙে গেলে তার নেতিবাচক প্রভাব ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজ—সবখানেই পড়ে।

বর্তমান সমাজের দিকে তাকালে আমরা এই ভারসাম্যহীনতার নির্মম চিত্র দেখতে পাই। প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে এমন খবর আসে যে উচ্চশিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত, সামাজিকভাবে সম্মানিত অনেক সন্তান তাদের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। কোথাও একজন শিক্ষক তার বৃদ্ধ মাকে পরিত্যাগ করেছেন, কোথাও একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা বা সচিব বাবা-মাকে একা ফেলে রেখেছেন, আবার কোথাও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা শেষ জীবনে অনাহার, অবহেলা, মানসিক কষ্ট ও নিঃসঙ্গতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এমনকি এই অবহেলা ও মানসিক যন্ত্রণার কারণে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে।

এ ধরনের ঘটনা শুধু একটি পারিবারিক ব্যর্থতা নয়; এটি একটি নৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়। যে বাবা-মা সন্তানের জন্য নিজের ঘুম, আরাম, অর্থ ও জীবনের বহু স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন, সেই সন্তান যখন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তাদের দিকে ফিরে তাকায় না, তখন সমাজের বিবেকও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এই প্রসঙ্গে নচিকেতার সেই বিখ্যাত গানের কথাগুলো মনে পড়ে যায়—“ফেলে এসেছি মাকে, বাবা মস্ত বড় অফিসার।” গানটি মূলত আধুনিক মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতার একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি। কর্মজীবনের সাফল্য, পদমর্যাদা, অর্থ ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্জনের পরও যদি কেউ নিজের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে সেই সাফল্যের মানবিক মূল্য কতটুকু—সেই প্রশ্ন গানটি উত্থাপন করে।

তবে সমস্যার আরেকটি দিকও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। সব ক্ষেত্রে সন্তানরাই একমাত্র দোষী নয়। অনেক সময় দেখা যায়, শৈশবে সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, পারিবারিক সহিংসতা, দীর্ঘদিনের অবহেলা বা অন্যায় আচরণের কারণে বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্ক গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইসলাম তাই শুধু সন্তানের কর্তব্যের কথা বলেনি; বরং বাবা-মাকেও ন্যায়পরায়ণ, স্নেহশীল ও দায়িত্বশীল হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। কারণ সুস্থ সম্পর্ক একতরফাভাবে গড়ে ওঠে না।

তবুও ইসলামের দৃষ্টিতে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন শুধু সামাজিক রীতি নয়, এটি ইবাদতের অংশ। একজন মুসলমানের জন্য বাবা-মায়ের সেবা জান্নাত লাভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “মা-বাবা হলো তোমার জান্নাত এবং তোমার জাহান্নাম।” অর্থাৎ তাদের সঙ্গে আচরণের ওপরই একজন মানুষের আখিরাতের সফলতা বা ব্যর্থতার বড় অংশ নির্ভর করতে পারে।

আজকের সমাজে যখন বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়ছে, যখন অসংখ্য বাবা-মা সন্তানের অপেক্ষায় দিন গুনছেন, যখন প্রতিষ্ঠিত সন্তানের অবহেলায় বৃদ্ধ মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটছে, তখন কোরআন ও সুন্নাহর শিক্ষার দিকে ফিরে যাওয়া জরুরি। পরিবারকে আবার দায়িত্ব, মমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। কারণ যে সমাজ তার বৃদ্ধদের সম্মান করতে জানে না, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজের ভবিষ্যৎকেও অসম্মান করে।

ইসলামের শিক্ষা স্পষ্ট—বাবা-মা সন্তানের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালন করবেন, সন্তান বাবা-মায়ের প্রতি তাদের কর্তব্য পালন করবে। এই ভারসাম্য রক্ষা হলেই পরিবারে শান্তি, সমাজে স্থিতি এবং মানুষের জীবনে কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হবে। আর যখন এই ভারসাম্য নষ্ট হয়, তখন তার ফলাফল হয় বিপরীতমুখী, বেদনাদায়ক এবং অনেক সময় ট্র্যাজিক। তাই পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার উচিত এই মূল্যবোধকে পুনর্জাগ্রত করা, যাতে কোনো বাবা-মাকে শেষ বয়সে অবহেলা, অপমান বা নিঃসঙ্গতার শিকার হতে না হয়।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক